বুড়িচংয়ে খেলার মাঠ দখল করে নির্মাণসামগ্রীর হাট; নেপথ্যে কারা?

জহিরুল হক বাবু।।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আনন্দ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠটি এখন আর খেলার উপযোগী নেই। দিনের পর দিন প্রভাবশালী একটি চক্রের দখলে পড়ে মাঠটি রূপ নিয়েছে নির্মাণসামগ্রীর খোলা বাজারে। প্রকাশ্যে ইট, বালু ও পাথর মজুত ও বেচাকেনা চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই প্রশাসনের।

Post Inside

মাঠ ঘুরে দেখা যায়, একাংশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ইট ও বালু, অন্য অংশে চলছে ট্রাক ও ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল। কোথাও গাড়ি চালানো শেখানোর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কোথাও আবার গৃহস্থালি কাজের সাময়িক স্থাপনা। ফলে মাঠটির অস্তিত্ব এখন কেবল নামেই সীমাবদ্ধ।

এই মাঠকে ঘিরে রয়েছে এরশাদ ডিগ্রি কলেজ, কালীনারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বুড়িচং পাবলিক স্কুল ও আনন্দ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। অদূরে হাজী ফজর আলী উচ্চ বিদ্যালয়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাদ্রাসাসহ অন্তত দশটির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এখানেই খেলাধুলা করতো।

জাতীয় দিবসের কুচকাওয়াজ, আন্তঃউপজেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের একমাত্র স্থান ছিল এই মাঠ। দখলের কারণে সবকিছুই এখন বন্ধ।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাঠ দখলের পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ একটি প্রভাবশালী চক্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, যারা প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন, তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, “দিনের আলোতেই মাঠ দখল করে ব্যবসা চলছে। বাধা দিতে গেলে ভয় দেখানো হয়। প্রশাসনে জানালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, এই ভয় দেখিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে রাখা হয়।”

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি আহমেদ বলেন, “মাঠে নামলেই ট্রাক আর ইটের স্তূপ। খেলাধুলা করতে না পারায় আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি। পড়াশোনার চাপ কমানোর কোনো সুযোগই নেই।”

শিক্ষকদের মতে, নিয়মিত খেলাধুলা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, “খেলার মাঠটি রক্ষায় চারপাশে দেয়াল নির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ এসেছিল। ঠিকাদার কাজ শুরুর প্রস্তুতি নিলে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলা হয়। আতঙ্কে ঠিকাদার এলাকা ছেড়ে চলে যান।”

প্রধান শিক্ষক আরও জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, “খেলার মাঠ দখলের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এর আগে দখলদারদের বিরুদ্ধে কয়েক দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত অভিযান চালিয়ে মাঠটি দখলমুক্ত করা হবে।”

শিক্ষা ও ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও বুড়িচংয়ের একমাত্র খেলার মাঠ দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা দ্রুত মাঠ দখলমুক্ত করে স্থায়ী সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। নচেৎ, প্রভাবশালীদের দখলে হারিয়ে যাবে বুড়িচংয়ের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলাধুলা ও সুস্থ বিকাশের একমাত্র আশ্রয়স্থল।

আরো পড়ুন
error: Content is protected !!