ক্যানসারে আক্রান্ত শিশু সাজিদকে বাঁচাতে বাবা-মায়ের আকুতি

আতাউর রহমান।।
যে বয়সের শিশুকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের আনন্দ ও আবেগময় সময় কাটানোর কথা, ঠিক সে বয়সের ক্যানসারে আক্রান্ত শিশু সাজিদকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিশেহারা পরিবারের সদস্যরা।

ছয় মাস বয়সী শিশু সাজিদ কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের কল্পবাস মধ্যপাড়া এলাকার মালেক হুজুর বাড়ির অটোরিকশা চালক হালিম মিয়া ও গৃহিণী স্বপ্না বেগম দম্পতির ছেলে। সাজিদ রেটিনোব্লাস্টোমা ( চোখের ক্যানসার ) রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হচ্ছে।

Post Inside

সাজিদের বয়স যখন মাত্র তিন মাস, তখন তার বাম চোখের মণির পাশে অস্বাভাবিক একটি লক্ষণ দেখতে পান মা স্বপ্না বেগম। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে কুমিল্লার আলেখারচর এলাকার একটি চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে জানা যায়, সাজিদ রেটিনোব্লাস্টোমা ( চোখের ক্যানসার ) রোগে আক্রান্ত।
ছেলের এমন মরণব্যাধির খবর পাওয়ার পর থেকেই ছেলেকে বাঁচাতে শুরু হয় বাবা হালিম মিয়া ও মা স্বপ্না বেগমের সংগ্রাম। সন্তানের জীবন বাঁচাতে তারা চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ছেলের চিকিৎসার পেছনে পরিবারের সব সঞ্চয় ব্যয় হয়ে গেছে। পাশাপাশি চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণও করতে হয়েছে তাদের। তবে বর্তমানে অর্থসংকটের কারণে সাজিদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাজিদের পরিবারের জন্য এটি নতুন কোনো ট্রাজেডি নয়। এর আগে একই রোগে তাদের প্রথম সন্তানকেও হারাতে হয়েছে। বিয়ের চার বছর পর ২০০৪ সালে দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় প্রথম সন্তান শান্ত। সন্তান জন্মের আনন্দে উচ্ছ্বসিত ছিল পুরো পরিবার। তবে সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শান্তর বয়স যখন দুই বছর, তখন তার চোখে ক্যানসার ধরা পড়ে। আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারায় মাত্র তিন বছর বয়সেই মৃত্যুবরণ করে সে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৩ সালে দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। এরপর ২০২৬ সালে জন্ম হয় ছেলে শিশু সাজিদের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বড় ভাই শান্তর মতো একই রোগে আক্রান্ত হয়েছে সাজিদও। এক সন্তানের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আরেক সন্তানকে একই রোগে আক্রান্ত অবস্থায় দেখে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।

চিকিৎসকের বরাত দিয়ে সাজিদের স্বজনরা জানান, বর্তমানে তাকে চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম চক্ষু চিকিৎসালয় ও প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পরামর্শে কেমোথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক চিকিৎসা পেলে এ রোগটি থেকে সাজিদ আরোগ্য লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন।

সাজিদের বাবা হালিম মিয়া ও মা স্বপ্না বেগম দুশ্চিন্তায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। ছেলের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ তারা কিভাবে জোগাড় করবেন, তা জানেন না। এ জন্য তারা সাজিদকে বাঁচাতে সবার কাছে আর্থিক সহায়তার আশা করছেন।

সাজিদের বাবা হালিম মিয়া বলেন, আমার প্রথম সন্তানও একই রোগে মারা গেছে। সাজিদের এ রোগ ধরা পড়ার পর থেকে আমাদের মনে শান্তি নেই। চিকিৎসার অভাবে যদি আমার এই ছেলেটাও মারা যায় তাহলে আমরা কি নিয়ে বাঁচবো!
তিনি বলেন, আমি হতদরিদ্র মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে কোনোরকমে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জীবন ধারণ করছি। এ পর্যন্ত ধারদেনা করে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমার পক্ষে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সমাজে অনেক বিত্তবান মানবিক মানুষ আছেন। তারা সাহায্য করলে আমার ছেলেটা বাঁচতে পারবে।

সাজিদের গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, পরিবারটি একেবারেই অসচ্ছল। কোনোরকমে খেয়ে-পরে বেঁচে আছে। তাদের পক্ষে এককভাবে শিশুটির চিকিৎসার ভার বহন করা সম্ভব নয়। সবার সহায়তায় পরিবারটির মধ্যে আশার আলো সঞ্চারিত হবে। সকলের সহযোগিতার অর্থে চিকিৎসা সম্পন্ন হলে বাবা-মা ফিরে পাবেন একমাত্র সন্তানকে। মানবিক দিক বিবেচনা করে ফুটফুটে শিশুটিকে বাঁচাতে সকলের কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানান তারা।

চোখের ক্যানসার রোগ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা বলেন, রেটিনোব্লাস্টোমা একটি বিরল ও মারাত্মক ক্যানসার যা রেটিনায় শুরু হয়। এটি প্রধানত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রভাবিত করে এবং চোখের স্নায়ুকোষে অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারণে টিউমার তৈরি করে। তবে সময়মতো নির্ণয় করা হলে এবং সঠিক চিকিৎসা পেলে এর নিরাময় হার প্রায় ৯০ শতাংশ।
তিনি বলেন, রেটিনোব্লাস্টোমা বা চোখের ক্যানসার রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চিকিৎসার মোট খরচ নির্ভর করে রোগের তীব্রতা এবং থেরাপির ধরনের ওপর। আমি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে শিশুটির চিকিৎসার জন্য যতটা সম্ভব সহায়তা প্রদান করবো। তিনি সাজিদের চিকিৎসা সহায়তায় বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সাজিদের জন্য বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পাঠানো যাবে। বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট নম্বর হলো ০১৮৬০১১৬৩৮২।

আরো পড়ুন
error: Content is protected !!