
জহিরুল হক বাবু।।
কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) হত্যা মামলায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)। নিজেকে হোটেলমালিকের ছেলে ও স্নাতক পাস পরিচয় দিয়ে তাজমিনের বিশ্বাস অর্জন এবং প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে রাজু একটি গেস্টহাউসের কর্মচারী এবং তিনি এসএসসি পরীক্ষাও পাস করেননি। অন্য মেয়েদের সঙ্গেও একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
তাজমিন হত্যা মামলার তদন্তে রাজুর সঙ্গে ওই কিশোরীর সম্পর্ক, তাঁদের মুঠোফোনে যোগাযোগ এবং কক্সবাজারে যাতায়াতের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে রাজুর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে জানা গেছে, নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে তাজমিনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন রাজু। পরে প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে ওই কিশোরীকে কক্সবাজারে নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাজমিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রকৃতি, যোগাযোগের কারণ এবং হত্যাকাণ্ডের আগে তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. অহিদুর রহমান বলেন, তাজমিন হত্যা মামলার তদন্তের স্বার্থে রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। হত্যাকাণ্ডে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
কক্সবাজার থেকে রাজুকে নিতে গিয়ে ফিরে আসে ডিবি
গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে তাজমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে রাজুকে কক্সবাজারের কলাতলী বিচ এলাকা থেকে আটক করে কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশ। পরদিন সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিতে কক্সবাজারে যায় কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার সদর থানা থেকে রাজুকে বের করে ডিবি পুলিশের একটি গাড়িতে তোলা হয়। তাঁকে গ্রহণের পর ডিবি সদস্যদের ফটোসেশন করতেও দেখা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত রাজুকে নিজেদের হেফাজতে না নিয়ে কক্সবাজার সদর থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে রেখেই ফিরে আসে দলটি।
এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, তাজমিন হত্যাকাণ্ডে রাজুর সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাঁকে গ্রহণ করেনি জেলা পুলিশ। রাজুকে গ্রহণ করা হয়েছে—এমন একটি চিঠি প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে জানানো হলে তিনি বলেন, “আমরা গ্রহণ করিনি।”
অন্যদিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. অহিদুর রহমান বলেন, “আমাকে ওসি প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল, তারা আসামিকে নিয়ে গেছে। পরে শুনলাম, তারা নেয়নি।”
রাজুকে হেফাজতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ডিবি
কুমিল্লা ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই পবিত্র সরকারের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, লালমাই থানার মামলা নম্বর ৪, তারিখ ৮ অক্টোবর ২০২৬, জিআর নম্বর ১১৮; দণ্ডবিধির ৩০২/৩০২/৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, নিহত জান্নাতুল তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ঘটনার আনুমানিক দুই দিন আগে সে কক্সবাজার সদর থানা এলাকায় অবস্থান করেছিল। ওই সময় কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশের হাতে আটক রাজুর সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া ঘটনার আগে তাদের মধ্যে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের সঙ্গে রাজুর পূর্বপরিচয় ও সম্পর্কের ধরন, ঘটনার আগে তাঁদের যোগাযোগের কারণ, ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগের তথ্য এবং হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে রাজুর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটনের জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় রাজুকে হস্তান্তরেরও অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাজমিনের মরদেহ
গত ৪ অক্টোবর নিখোঁজ হয় জান্নাতুল তাজমিন। সে কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত সে। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে খোঁজাখুঁজি করা হয়।
নিখোঁজের চার দিন পর, ৮ অক্টোবর, কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক সড়কের পাশে একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হলে তদন্তে নামে পুলিশ। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধর্ষণের পর তাজমিনকে হত্যার কথা স্বীকার করে সুমন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাজুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসে। ঘটনার আগে কক্সবাজারে তাজমিনের অবস্থান এবং রাজুর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের তথ্য পাওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেয় কুমিল্লা ডিবি।
তবে রাজুর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ, তাজমিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।